মেকলে মিনিট কি | Macaulay Minute in Bengali

Q: মেকলে মিনিট কি | Macaulay Minute in Bengali
Q: মেকলে মিনিট টীকা লেখো।

উত্তর:

মেকলে মিনিট (Macaulay Minute)

ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এদেশে একটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার ঘটানো বিশেষ প্রয়োজন দেখা দেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে প্রাচ্য শিক্ষা নাকি আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার পূর্বে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এদেশীয় পণ্ডিতরা প্রাচ্য শিক্ষার প্রবর্তনের কথা বললেও ইংরেজরা এদেশে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের দাবি করেন।

বড় লাট লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে (1828 – 35 খ্রি) কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন এর সভাপতি ও উগ্র পাশ্চাত্যবাদী থমাস ব্যাবিংটন মেকলে (Thomas Babington Macaulay) ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের দাবি জানিয়ে 1835 সালে 2 ফেব্রুয়ারি বড়লাটের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেন, যা ‘মেকলে মিনিট বা মেকলের প্রস্তাব’ নামে পরিচিত।

মেকলে ছিলেন একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, যে সমস্ত ইংরেজ আধিকারিক ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে ছিলেন, তাদেরই একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন থমাস ব্যাবিংটন মেকলে। ভারতের জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্পর্কে তার মূল্যায়ন ছিলো- “A single self of a good European library is worth the whole literature of India and Arabia”. ইউরোপের একটি ভালো গ্রন্থাগারের বই ভর্তি একটি তাক ভারত ও আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমান।

Thomas Babington Macaulay

তিনি ভারতে ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ খ্রিঃ পর্যন্ত, মাত্র ৪ বছর ছিলেন। কিন্তু এই চার বছরের মধ্যে তিনি ভারতে অসাধারণ দুটি কাজ করে যান, যেগুলি ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে প্রায় শত বৎসর ব্যাপী স্থায়িত্ব প্রদান করেছিলো।

• মেকলের এই অসাধারণ দুটি কাজের মধ্যে প্রথমটি ছিলো, ভারতীয় দন্ড বিধি বা ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের রূপায়ন করা।

• দ্বিতীয় টি ছিলো ভারতে শিক্ষা বিস্তারের সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতি ও পদ্ধতির ঘোষনা করা।

মেকলের দৃষ্টিভঙ্গি :

মেকলে মনে প্রানে চাইতেন, ভারতে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ ভাবধারা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে। সমাজের উচ্চ বর্ণের ভারতীয়দের মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার চুইয়ে পড়ে সমাজের নিম্ন বর্ণের মানুষের কাছে না পৌঁছালেও তাদের মধ্যে আধুনিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তিনি চাইতেন, এই ভাবধারায় রঞ্জিত হয়ে এমন একটি সম্প্রদায় তৈরি হোক, যারা বর্নে ও রক্তে ভারতীয় হলেও, রুচি, মানসিকতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে হবেন ইওরোপীয়।

মেকলে তার শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এইরকম কিছু সম্ভাবনার বীজ রেখে গিয়েছিলেন। যা পরবর্তীকালে মহীরুহ হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে “নিরাপত্তা” এবং “স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা” দুটোই প্রদান করেছিলো।

সরকারি আধিকারিকদের সমস্ত আশঙ্কা দূর করে, তাদের আশ্বস্ত করে মেকলে বলে গিয়েছিলেন, “সেদিন আসতে এক শতাব্দী দেরি আছে। যদি সেই রকম দিন আসে তবে সেটাই হবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শ্রেষ্ঠ সফলতা। মেকলের এই আশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ বাণী একে বারেই মিথ্যা হয়ে যায়নি। এটি থেকেই বোঝা যায়, তিনি কি পরিমান অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।

মেকলে মিনিটের প্রেক্ষাপট :

1) ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনে বলা হয়, কোম্পানি ভারতের শিক্ষাখাতে কমপক্ষে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করবে। এই বিষয়ে নীতি নির্ধারণের জন্য ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন গঠিত হয়েছিল।

2) জন শিক্ষা কমিটি গঠন করবার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই অর্থ, প্রাচ্য না পাশ্চাত্য কোন শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক দেখা যায়।

3) এই বিতর্ক নিরসনের জন্য এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য “প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য” দুই গোষ্ঠীর সদস্যরাই পৃথক পৃথক ভাবে সরকারের কাছে আবেদন পেশ করেন।

4) লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৩৪ খ্রিঃ তার আইন সচিব থমাস ব্যাবিংটন মেকলেকে জন শিক্ষা কমিটির সভাপতি হিসাবে নিযুক্ত করেন, এবং মূল বিতর্ক নিরসনের দায়িত্ব দেন।

মেকলে মিনিটের মূল বক্তব্য / মেকলের প্রস্তাব :

মেকলে তার প্রতিবেদনে বলেন –

• প্রাচ্যের শিক্ষা বৈজ্ঞানিক, চেতনাহীন এবং পাশ্চাত্যের তুলনায় নিকৃষ্ট।

• প্রাচ্যের সভ্যতা “দুর্নীতিগ্রস্থ এবং অপবিত্র”। তাই এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তিত হওয়া উচিৎ।

• এদেশের উচ্চ ও মধ্য বিত্তদের মধ্যে ইংরেজী শিক্ষার প্রসার ঘটলে “ক্রম নিন্ম পরিশ্রুত নীতি” বা চুঁইয়ে পড়া নীতি অনুসারে তা ক্রমশ সাধারন দেশবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।

• মেকলের মতে ভারতে ইংরেজি ভাষা প্রবর্তিত হলে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় শিক্ষিত কর্মচারী নিয়োগ করা সহজ হবে।

• মেকলের লক্ষ্য ছিল, পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে এমন এক ভারতীয় গোষ্ঠী তৈরি হবে তারাই পরে জনগণের মধ্যে নতুন জ্ঞান প্রচার করবে এবং ইংরেজি শিক্ষার ফলে ভারতে নবজাগৃতি আসবে। মেকলে প্রস্তাব অনুযায়ী ১৮৩৫ সালের ৭ই মার্চ লর্ড বেন্টিঙ্ক ইংরেজি শিক্ষাকে সরকারি নীতি রূপে ঘোষণা করেন।

• মেকলে মিনিটের দ্বারা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা সংক্রান্ত দীর্ঘ বিতর্কের নিরসন হয় এবং ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার সম্পর্কে যাবতীয় সংশয়, ও দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে।

• “প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা” সংক্রান্ত বিতর্কে পাশ্চাত্যবাদীদের জয় সুনিশ্চিত হয়।

• মেকলের শিক্ষা নীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েই ভারতে পরবর্তী কালে পোশাকে আশাকে একটি ইংরেজ অনুগত শ্রেনী গড়ে ওঠে।

আরো পড়ুন

স্কিনার বক্স কি | What is Skinner Box

গেস্টাল্ট মতবাদ কি | গেস্টাল্ট মতবাদের মূল সূত্র বা নীতি

শিক্ষার অর্থ ও সংজ্ঞা | শিক্ষার প্রকৃতি | Meaning and Nature of Education

শিক্ষার সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক আলোচনা করো

বুদ্ধি কি | বুদ্ধির সংজ্ঞা দাও | বুদ্ধির কাজ কি | বুদ্ধির বৈশিষ্ট্য কি

Leave a Comment

error: Content is protected !!