ডেলরস কমিশন কী | Delors Commission (1996)

ডেলরস কমিশন কী | Delors Commission (1996)

উত্তর:

ডেলরস কমিশন

বিশ্বব্যাপী শিক্ষার প্রসার ও তার মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা UNESCO পক্ষ থেকে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে জ্যাক ডেলারের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন ডেলরস কমিশন নামে পরিচিত। জ্যাক ডেলারকে সমগ্র বিশ্ব থেকে বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি ও পেশাগত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ১৪ জন ব্যক্তিকে নিয়ে তা সভাপতিত্বে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের জন্য অনুরোধ করা হয়। কমিশন ছয়টি মূলনীতির কথা উল্লেখ করে :

ডেলরস কমিশন
Jacques Delors

1) শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং তা আন্তর্জাতিক মানব মূল্যায়নের উপর প্রতিষ্ঠিত।

2) প্রথাগত বা প্রথা বহির্ভূত সমস্ত ধরনের শিক্ষা জ্ঞানের অগ্রগতি এবং বিস্তারকে হাতিয়ার করে সমাজের পরিষেবার কাজে যুক্ত হবে।

3) শিক্ষার তিনটি নীতি হবে সমতা, প্রাসঙ্গিকতা এবং উৎকর্ষ।

4) পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনমতো শিক্ষার সংস্কার সাধন করতে হবে।

5) শিক্ষার বিকাশে আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কমিউনিটি UNO মৌলিক এবং সর্বসম্মত মূল্যবোধের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

6) শিক্ষার দায়িত্ব হবে সমগ্র সমাজের।

কমিশন 1996 সালে 11 এপ্রিল ডিরেক্টর জেনারেল এর কাছে ‘Learning: The Treasure Within’ এই শিরোনামে একটি রিপোর্ট পেশ করেন। একুশ শতকের শিক্ষার উপর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটিতে শিক্ষার চারটি স্তম্ভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলি হল-

1) জানার জন্য শিক্ষা (Learning to Know) :

জানার জন্য শিক্ষা বলতে সেই শিখন প্রক্রিয়াকে বুঝায় যা শিক্ষার্থীকে বিশ্বজগতের নানা বস্তু সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে। জ্ঞান যে কোন মানুষকে বিকাশের পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে।

i) জ্ঞান অর্জনের জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মনো সংযোগের প্রয়োজন হয়।

ii) অনুশীলন করার প্রয়োজন হয়।

iii) জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর স্মৃতিশক্তির অনুশীলন হয়।

iv) বিভিন্ন উপাদান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্য মনে রাখার কৌশল গুলি প্রয়োগের মাধ্যমে স্মৃতি শক্তির উন্নতি ঘটানো যায়।

v) শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যা মূলক পরিস্থিতির সমাধান করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর চিন্তন ক্ষমতার বিকাশ ঘটে।

vi) জ্ঞান অর্জনের ফলে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়। জ্ঞানের অভাবে মানুষ ধর্মান্ধ, কুসংস্কারচ্ছন্ন ও অন্ধবিশ্বাসে আসক্ত হয়। জ্ঞানই মানুষকে সঠিক ধারনা দিতে পারে ও কুসংস্কার মুক্ত করতে পারে।

2) কর্মের জন্য শিক্ষা (Learning to do) :

কর্মের জন্য শিক্ষা বলতে শুধুমাত্র কাজ সম্পন্ন করা নয়। এর অর্থ হল কাজে উৎকর্ষ আনা। কাজে দক্ষ হওয়া, নতুন পরিস্থিতিতে দলবদ্ধ ভাবে কাজ করা। শিক্ষা গ্রহণের সময় শিক্ষার্থীকে যদি কর্ম অভিজ্ঞতা বা সামাজিক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় তাহলে তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে এবং তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতার ব্যবহারের সুযোগ পাবে। আধুনিক শিক্ষায় শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন করলেই চলে না। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কাজে দক্ষ হয়ে উঠতে হয়। কর্মদক্ষতা অর্জন করতে না পারলে ব্যক্তিজীবনে ও সমাজ জীবনে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

1) এই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীর দৈহিক বিকাশ ঘটানো, স্বাধীন চিন্তা শক্তির বিকাশ ঘটানো এবং শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত ক্ষমতা জাগিয়ে তোলা।

2) শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক চেতনার বিকাশ ঘটানো। নানা সামাজ সেবামূলক কাজে উদ্ভূত করা।

3) কর্মমূলক শিক্ষার মধ্য দিয়ে সমাজে প্রয়োজনীয় উৎপাদনমূলক দ্রব্য উৎপন্ন হয় এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাজ চেতনার জাগ্রত হয় যা সামাজিক বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

4) বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।

3) একত্রে বসবাসের জন্য শিক্ষা (Learning to live together) :

একত্রে বসবাস করার শিক্ষা বলতে পরস্পর মিলেমিশে থাকার শিক্ষাকে বোঝায়। মানুষের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে বিশ্বভ্রাতৃত্বের পথে অগ্রসর হতে প্রেরণা যোগায়। এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হল সম্প্রদায় ও জাতিগত ক্ষুদ্রতা থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত করা। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই শিক্ষার অভাবে মানুষে মানুষের সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, মানবিকতার অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়। 

i) একত্রে বেঁচে থাকা জীবনব্যাপী শিক্ষার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। একত্রে বেঁচে থাকার অর্থ হল পরস্পরকে বোঝা, পরস্পরকে সহযোগিতা করা, মূল্যবোধ সম্পর্কে অবহিত হওয়া, শ্রদ্ধা করা, পারস্পারিক নির্ভরশীলতাকে উপলব্ধি করা।

ii) শিক্ষার্থীদের এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া উচিত যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা একদিকে দেশের সুনাগরিক হয়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে বহির বিশ্বের দেশগুলি সম্পর্কে সঠিক ও অপরিহার্য বিষয়গুলির অনুধাবনে সক্ষম হয়।

iii) জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষাগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে যে ঐক্য বর্তমান তার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। 

(iv) সমাজে কোনো না কোনো সময় সমস্যা দেখা দেয়। যে সমস্যার সমাধান একা একা করা সম্ভব নয়। তাই একত্রে সকলে মিলে এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলে সেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়। একত্রে বেঁচে থাকার শিক্ষা ব্যক্তিকে এই ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করে।

4) মানুষ হওয়ার শিক্ষা (Learning to be) :

মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা বলতে বোঝায় সেই শিক্ষা যার মাধ্যমে ব্যক্তির বিবেক, মনুষ্যত্ব, নৈতিকতা পারস্পরিক সহযোগিতা প্রভৃতি গুণের বিকাশ ঘটে। এই শিক্ষার মূল কথা হল মূল্যবোধ গড়ে তোলা। যথাযথ মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠলে মানুষ সহজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

i) আধুনিক বিশ্বে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে গেলে এই শিক্ষার প্রয়োজন।

ii) যুক্তিসহকারে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি, শারীরিক ক্ষমতা, নান্দনিক ক্ষমতা, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার ক্ষমতা ইত্যাদি।

iii) মানুষ হওয়া শিক্ষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পরিবর্তনশীল পরিবেশকে স্বাগত জানিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করা। কোন রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি যেন চলার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

iv) মানুষ হওয়ার শিক্ষার মধ্য দিয়েই সামাজিক ন্যায় সকলের সমান অধিকার, সকলকে মর্যাদা দান ন্যায্য অধিকার ইত্যাদি গণতান্ত্রিক মানসিকতা বিকশিত হয়।

v) প্রত্যেকটা ব্যক্তির মধ্যে কোন না কোন সৃজনশীল ক্ষমতা থাকে। শিক্ষার মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। এর ফলে ব্যক্তির মধ্যে তৃপ্তি আসে। অন্যদিকে তেমনি সমাজের উন্নয়নেও সাহায্য করে।

আরো পড়ুন

কোঠারি কমিশন (1964-66) | Indian Education Commission in Bengali

রাধাকৃষ্ণন কমিশন বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশন | Radhakrishnan commission (1948-49) in Bengali

মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে কোঠারি কমিশনের সুপারিশ | Kothari Commission (1964-66) in Bengali

জাতীয় উন্নয়নে কোঠারি কমিশনের সুপারিশ | National Policy on Education (NPE) in Bengali

Leave a Comment

error: Content is protected !!