মুদালিয়ার কমিশনের সুপারিশ | Mudaliar Commission (1952-53) in Bengali

মুদালিয়ার কমিশনের সুপারিশ | Mudaliar Commission (1952-53) in Bengali
অথবা, মুদালিয়ার কমিশনের মতে মাধ্যমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
অথবা, মুদালিয়ার কমিশনের সুপারিশ গুলি আলোচনা কর
অথবা, মুদালিয়ার কমিশনের শিক্ষা কাঠামোটি উল্লেখ করো

উত্তর:

মুদালিয়ার কমিশন (Secondary Education Commission)

স্বাধীনতা লাভের পর তৎকালীন ভারতের প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। 1951 সালে কেন্দ্রীয় শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ এ দেশের প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যালােচনা করেন। মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি কমিশন গঠন করার কথা বলেছিলেন। এই প্রস্তাব অনুসারে ভারত সরকার “1952 সালে 23 সেপ্টেম্বর” মাধ্যমিক শিক্ষা কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনের সভাপতি ছিলেন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর লক্ষণ স্বামী মুদালিয়ার, তাই তার নাম অনুসারে এই কমিশনকে ‘মুদালিয়ার কমিশন’ ও বলা হয়ে থাকে। এটি ছিল স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় শিক্ষা কমিশন, একে আবার Secondary Education Commission ও বলা হয়।

ডক্টর এ. লক্ষণস্বামী মুদালিয়ার

এই কমিটির সভাপতি ছিলেন ডক্টর এ. লক্ষণস্বামী মুদালিয়ার, অক্সফোর্ডের জেমস কলেজের অধ্যক্ষ জন ক্রিস্টি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডক্টর কিনেথ রাস্ট উইলিয়াম, ডক্টর কে. এস. শ্রীমালি, শ্রীমতি হংস মেহতা, শ্রী জে. এ. তারাপরেওয়ালা, শ্রী এম. টি. ব্যাস, শ্রী কে. জি. সৈদাইন, শ্রী এ. এন. বসু।

মুদালিয়ার কমিশনের সুপারিশ :

মাধ্যমিক শিক্ষার লক্ষ্য : 

• শিক্ষার লক্ষ্য হবে সুযােগ্য নাগরিক সৃষ্টি করার, • জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি, 

• গণতান্ত্রিক মনােভাব গড়ে তােলা, 

• সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উন্নয়ন, 

• নেতৃত্বের যােগ্যতা অর্জন, 

• অর্থনৈতিক বিকাশের সহায়ক

মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামাে :

মানবজীবনের প্রস্তুতির জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, সেজন্য মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর পরিকল্পিতভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। 

1) সাধারণ শিক্ষার কাঠামাে :

a) কমিশনের মতে বিদ্যালয় শিক্ষা হবে 11 বছরের।

b) নতুন কাঠামাে অনুযায়ী চার থেকে পাঁচ বছরের প্রাথমিক বা নিম্ন বুনিয়াদি স্তরের পর মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু হবে। 

c) মাধ্যমিক শিক্ষাকে 2 ভাগে ভাগ করা হয়েছে –  i.নিম্ন মাধ্যমিক ও ii.উচ্চমাধ্যমিক। নিম্ন মাধ্যমিক স্তর তিন বছরের এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরও হবে তিন বছরের। 

d) মহা বিদ্যালয় শিক্ষার ইন্টারমিডিয়েট স্তর টি ছিল তাকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে – প্রথম এক বছর উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হবে এবং শেষ বছরটি ডিগ্রী কোর্সের সঙ্গে যুক্ত হবে।

e) ডিগ্রী কোর্সের সময়কাল হবে 3 বছরের।

যেসব শিক্ষার্থী স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য ডিগ্রী কোর্স করতে চায় তাদের প্রথমে এক বছর প্রাক বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স করতে হবে, এবং যারা বৃত্তিগত বা পেশাগত শিক্ষায় পড়তে চাইবে তাদের এক বছরের প্রাক বৃত্তি মূলক কোর্স করতে হবে। 

f) শিক্ষার্থীরা যাতে তার রুচি, চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষালাভের সুযােগ পায় তার জন্য মাধ্যমিক স্তরে বহুমুখী বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।

g) গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় গুলিতে উদ্যানপালন, কৃষিবিদ্যা, কুটির শিল্প প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য সুপারিশ করতে হবে।

2) কারিগরি শিক্ষার কাঠামাে :

a) প্রত্যেকটি রাজ্যের পৃথকভাবে বহুমুখী বিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিক সংখ্যক কারিগরি বিদ্যালয়, প্রযুক্তি বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। 

b) দেশের বড় বড় শহরগুলিতে কেন্দ্রীয় কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। 

c) বড় বড় শিল্পাঞ্চল গুলিতে কলকারখানার নিকটবর্তী অঞ্চলে কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে যাতে তারা হাতেকলমে কাজ করতে পারে। 

d) কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রযুক্তি শিক্ষার পাঠক্রম, নিয়ম নীতি নির্ধারন ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণের জন্য All India Council For Technical Education (AICTE) এর মত সংস্থাগুলির সঙ্গে যােগাযােগ রেখে পাঠক্রম পরিচালনা করতে হবে।

e) কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য কমিশন শিল্প-শিক্ষাকর (Industrial Education Tax) ধার্য করার সুপারিশ করেন।

3) সহশিক্ষা (Co-education) এর কাঠামাে : 

a) শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে উভয়েই একই ধরনের শিক্ষার সুযােগ লাভ করবে।

b) সহ-শিক্ষার বিদ্যালয় এবং বালিকা বিদ্যালয় গুলিতে কেবল মেয়েদের জন্য গার্হস্থ্য বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

c) দেশে যে সকল অঞ্চলে স্ত্রী শিক্ষা প্রসার ঘটেনি সেই সকল অঞ্চলের সরকারি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।

d) বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষিকাদের প্রয়ােজন মেটানাের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পাঠক্রম :

মুদালিয়ার কমিশন প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠক্রম এর ত্রুটি নির্ণয় করেন এবং পাঠক্রমে র কতকগুলি নীতির কথা বলেছেন। সেগুলি হল – 

a) পাঠক্রম হবে শিক্ষার্থীর চাহিদা কেন্দ্রিক, অবশ্যই শিক্ষার্থীর আগ্রহ, দৈহিক, মানসিক, সামাজিক সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে পাঠক্রম রচনা করতে হবে।

b) পাঠক্রমে শিক্ষার্থীদের সৃজনাত্বক প্রতিভার বিকাশ ঘটবে।

c) সমাজের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে পাঠক্রম রচনা করতে হবে।

d) পাঠক্রম কখনো চিরস্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় হবে না।

e) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জনের উপযােগী করে তুলতে হবে।

1) নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় :

নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের জন্য যেসব বিষয় পড়ানাের ব্যবস্থা করতে হবে সেগুলি হল- ভাষা, সমাজ শিক্ষা, সাধারণ বিজ্ঞান, গণিত, কলা ও সংগীত, হাতের কাজ, শারীর শিক্ষা, শিল্প।

2) উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় :

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা শেষ করার পর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীরা তাদের আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারবে। মুদালিয়ার কমিশন পাঠক্রম কে দুটি অংশে ভাগ করেছেন – আবশ্যিক বিষয় (Compulsory Subjects) এবং অপরটি হলাে ঐচ্ছিক বিষয় (Optional Subjects) এছাড়াও থাকবে অতিরিক্ত বিষয় (Additional Subjects)। 

a) আবশ্যিক বিষয় (Compulsory Subjects) :

আবশ্যিক বিষয়গুলি সকল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযােজ্য করার কথা বলা হয়েছে, এই পর্যায়ে দুটি ভাষা শেখার কথা বলা হয়েছে – 

i) মাতৃভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা।

ii) হিন্দি, ইংরেজি, প্রাথমিক ইংরেজি, একটি আধুনিক ভারতীয় ভাষা, একটি আধুনিক ইউরােপীয় ভাষা, একটি প্রাচীন ভাষা এগুলির মধ্যে থেকে যে কোন একটি ভাষা শিক্ষার্থীরা নির্বাচন করবে।

iii) এছাড়াও থাকবে সমাজবিজ্ঞান, গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান ও হাতের কাজ বা হস্তশিল্প।

b) ঐচ্ছিক বিষয় (Optional Subjects) : মাধ্যমিক শিক্ষাকমিশন পাঠক্রমের ঐচ্ছিক বিষয়গুলি কে ‘7’ টি মূল প্রবাহে ভাগ করেছেন। একে আবার সপ্তপ্রবাহ বলা হয়ে থাকে। এই সাতটি বিষয় হলাে – 

i) মানবিক বিদ্যা (Humanities)

ii) বিজ্ঞান (Science)

iii) কারিগরি বিদ্যা (Technical)

iv) বাণিজ্য (Commerce)

v) কৃষিবিদ্যা (Agricultural Science) 

vi) চারুকলা (Fine Arts) 

vii) গার্হস্থ্য বিজ্ঞান (Home Science)।

এই সাতটি বিভাগের মধ্যে যেকোনাে বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীকে তিনটি বিষয় নির্বাচন করতে হবে।

c) অতিরিক্ত বিষয় (Additional Subjects) : শিক্ষার্থীরা উপরােক্ত বিষয়গুলাে থেকে আরাে একটি বিষয়কে অতিরিক্ত হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে।

শিক্ষণ পদ্ধতি :

কমিশন মনে করেন শিক্ষার উন্নতির জন্য কেবল পাঠক্রম রচনা করলেই হবেনা শিক্ষাদান পদ্ধতিও গতিশীল ও উন্নত মানের করতে হবে, তাই কমিশন শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে বলেছেন –

a) গতানুগতিক মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে কর্মকেন্দ্রিক করতে হবে।

b) মুখস্তের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী প্রকল্পের সাথে যুক্ত করতে হবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তা ভাবনা বিকাশ ঘটাতে পারবে।

c) শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাতে সহযােগিতার মনােভাব গড়ে ওঠে এবং তারা যাতে দলগতভাবে কাজের সুযােগ পায় সে বিষয়গুলাের ওপর নজর দিতে হবে।

d) শিক্ষাদান পদ্ধতি শুধু স্কুলের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে না, পাঠাগার এ যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশােনার সুযােগ পায় সে বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে।

e) শিক্ষাপদ্ধতি এমন হবে যাতে মেধাবী, অল্প মেধাবী সব রকম ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষার সুযােগ পায়। 

f) শিক্ষাদানের সময় ছাত্র-ছাত্রীদের মনােযােগ আকর্ষণ করার জন্য কঠিন বিষয়কে সহজ করে বােঝানাের জন্য বিভিন্ন রকম শিক্ষা সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করতে হবে।

পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা : 

শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষার স্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিখনের সাফল্য পরিমাপ করা হয়, তাই আমাদের দেশে প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি গুলি কে দূর করে, পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্দেশ্যে কমিশন কতগুলি সুপারিশ করেছেন – a) গতানুগতিক পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত করতে হবে। 

b) রচনাধর্মী পরীক্ষার পরিবর্তে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে।

c) শুধুমাত্র বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার পরিবর্তে বিদ্যালয় জীবনের বিভিন্ন ঘটনা গুলিকে কিউমুলেটিভ রেকড কার্ড (Cumulative Record Card) এ লিপিবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। 

d) মাধ্যমিক স্তরে শেষে কেবলমাত্র একটি সাধারণ বহি পরীক্ষা গ্রহণের সুপারিশ করেন।

e) পরীক্ষার নম্বর সংখ্যামান এর পরিবর্তে গ্রেড প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিদ্যালয় পরিচালনা সম্পর্কিত সুপারিশ : 

a) কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা 750 এর বেশি হবে না। 

b) প্রত্যেকটি শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা 30 থেকে 40 এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

শিক্ষক সম্পর্কিত সুপারিশ : 

a) শিক্ষকদের যােগ্যতা অনুযায়ী বেতন দিতে হবে। 

b) শিক্ষকদের অবসরের সময় হবে ৫০ বছর। 

c) শিক্ষকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।

d) বিদ্যালয়ে নিযুক্ত কোন শিক্ষক গৃহশিক্ষকতা করতে পারবেন না।

e) শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য পেনশন এর ব্যবস্থা থাকবে।

f) প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের জন্য সরকার স্নাতকদের জন্য এক বছরের এবং যারা স্নাতক নয় তাদের জন্য দু’বছরের শিক্ষক শিখন এর ব্যবস্থা করবে।

আরো পড়ুন

মাধ্যমিক শিক্ষা কমিশনের বা মুদালিয়ার কমিশনের ত্রুটি গুলি কি কি

বৃদ্ধি ও বিকাশের মধ্যে পার্থক্য | জীবন বিকাশের বিভিন্ন স্তর | Difference between Growth and Development

রাধাকৃষ্ণন কমিশন বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশন | Radhakrishnan commission (1948-49) in Bengali

কোঠারি কমিশন (1964-66) | Indian Education Commission in Bengali

মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে কোঠারি কমিশনের সুপারিশ | Kothari Commission (1964-66) in Bengali

জাতীয় উন্নয়নে কোঠারি কমিশনের সুপারিশ | National Policy on Education (NPE) in Bengali

Leave a Comment

error: Content is protected !!